বৈশ্বিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক চাপ এবং অভ্যন্তরীণ নীতিমালা পরিবর্তনের ফলে দেশটিতে কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিদেশী কর্মী নিয়োগেও আগের তুলনায় কঠোরতা বাড়ছে। সেই সঙ্গে কমতে শুরু করেছে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ।
এদিকে মালয়েশিয়া সরকার স্থানীয় নাগরিকদের কর্মসংস্থান বাড়াতে বিদেশী শ্রমিকের সংখ্যা কমানোর পরিকল্পনা নিয়েছে। বর্তমানে দেশটির মোট শ্রমশক্তির ১৪ শতাংশের বেশি বিদেশী হলেও তা ২০৩৫ সালের মধ্যে ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে কম দক্ষ বিদেশী শ্রমিকদের জন্য সুযোগ আরো সীমিত হয়ে পড়ছে দেশটিতে।
মালয়েশিয়ায় চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) মোট ২৪ হাজার ১০০ কর্মীকে ছাঁটাই করা হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৪৭ শতাংশ বেশি। দেশটির সোশ্যাল সিকিউরিটি অর্গানাইজেশনের তথ্য বিশ্লেষণ করে এ তথ্য জানিয়েছে হং লিয়ং ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এইচএলআইবি)। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত জানুয়ারিতে সবচেয়ে বেশি ১০ হাজার ৭০০ কর্মী ছাঁটাই করা হয়। ফেব্রুয়ারিতে চাকরি হারান ৭ হাজার ৫০০ ও মার্চে ৫ হাজার ৯০০ জন। গত বছরের একই সময়ে (জানুয়ারি-মার্চ) মোট ১৬ হাজার ৪৭৫ কর্মী ছাঁটাই হয়েছিলেন। তুলনামূলক হিসাবে দেখা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারিতে ছাঁটাই বেড়েছে ৪১ দশমিক ৩৫ শতাংশ, ফেব্রুয়ারিতে ৩৮ দশমিক ৮৯ ও মার্চে ২৩ শতাংশ।
দেশটির সরকার ২০২৫ সালে প্রণীত সর্বশেষ পাঁচ বছর মেয়াদি জাতীয় কৌশলপত্রে স্বল্প দক্ষ বিদেশী শ্রমিকের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার বিষয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছে। ‘ত্রয়োদশ মালয়েশিয়া পরিকল্পনা’ শীর্ষক এ নথিতে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে কম দক্ষ ও স্বল্প বেতনের বিদেশী শ্রমিক নিয়োগের প্রবণতা দেশটির অর্থনীতিতে আধুনিক প্রযুক্তির প্রবেশকে বাধাগ্রস্ত করছে। এ ধরনের নিয়োগের কারণে শ্রমবাজারে তৈরি হয়েছে ভারসাম্যহীনতা। বিশেষ করে বেতন কাঠামোয় অসামঞ্জস্য দেখা দিয়েছে এবং সামগ্রিক উৎপাদনশীলতাও কমেছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকার স্থানীয় কর্মীদের নিয়োগ বাড়াতে এবং বিদেশী শ্রমিকের ওপর নির্ভরতা কমাতে গুরুত্ব দিচ্ছে।
বর্তমানে মালয়েশিয়ার মোট শ্রমশক্তির ১৪ শতাংশের বেশি বিদেশী কর্মী। সরকার ২০৩৫ সালের মধ্যে এ হার কমিয়ে ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা নিয়েছে। এ লক্ষ্য অর্জনে ধাপে ধাপে বিভিন্ন নীতিমালা বাস্তবায়ন করা হবে। তাই বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থানীয়দের কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি বিদেশী কর্মী কমানোর এ উদ্যোগ মালয়েশিয়ায় কর্মরত প্রবাসী শ্রমিকদের চাকরির বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ শ্রমবাজার মালয়েশিয়ায় বর্তমানে আট লাখের বেশি বাংলাদেশী কর্মরত। দেশটিতে নিযুক্ত বাংলাদেশ হাইকমিশন ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যে এ সংখ্যা জানা গেছে। এর বাইরে আরো কয়েক লাখ বাংলাদেশী অবৈধভাবে সেখানে অবস্থান করছেন বলেও ধারণা করা হয়।
মালয়েশিয়ার সংবাদমাধ্যম দ্য স্টারের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের জুন শেষে বৈধভাবে কাজের অনুমতি থাকা বাংলাদেশী কর্মীর সংখ্যা ছিল ৮ লাখ ৩ হাজার ৩৩২। তবে ২০২৪ সাল থেকে বাংলাদেশী শ্রমিকদের জন্য মালয়েশিয়ায় নতুন ভিসা বন্ধ রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার এ ভিসা পুনরায় চালুর চেষ্টা করলেও তাতে তেমন অগ্রগতি হয়নি। বর্তমানে নতুন সরকারও মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালু করতে কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।
এ লক্ষ্যে গত সপ্তাহে মালয়েশিয়া সফর করেন শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনের পর এটি ছিল শ্রমবাজার ইস্যুতে প্রথম উচ্চপর্যায়ের সফর। সফরকালে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন তারা। পাশাপাশি দেশটির মানবসম্পদমন্ত্রী দাতো শ্রী রমণন রামকৃষ্ণনের নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধি দলের সঙ্গেও দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া উচ্চশিক্ষামন্ত্রী জাম্ব্রি আবদুল কাদিরের সঙ্গেও বৈঠক করেন উপদেষ্টা মাহদী আমিন।
সফর শেষে সচিবালয়ে এক ব্রিফিংয়ে মাহদী আমিন জানান, প্রবাসীদের জীবনমান উন্নয়নে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কম খরচে ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় কর্মী পাঠানো নিশ্চিত করতে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে কোনো ধরনের সিন্ডিকেট যেন না থাকে, সে বিষয়েও মালয়েশিয়া কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করা হয়েছে। এছাড়া শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়ে দুই দেশের সরকারই ইতিবাচক। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী যেমন আগ্রহী, তেমনি মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীও এ বিষয়ে সহযোগিতামূলক মনোভাব দেখিয়েছেন।
সার্বিকভাবে যুদ্ধজনিত বৈশ্বিক অস্থিরতা ও অভ্যন্তরীণ নীতিগত পরিবর্তনের সম্মিলিত প্রভাবে মালয়েশিয়ার চাকরির বাজার ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে বিদেশে কর্মসংস্থানের স্বপ্ন দেখা শ্রমিকদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, প্রযুক্তিনির্ভর খাতে দক্ষ কর্মীদের জন্য এখনো সুযোগ রয়েছে। সাধারণ শ্রমবাজারে চাপ বাড়লেও মালয়েশিয়ার আইটি, স্বাস্থ্যসেবা ও প্রকৌশল খাতে দক্ষ কর্মীর চাহিদা আছে।
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্যমতে, অবশ্য মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রফতানির ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক সময়ে বড় ধরনের ধীরগতি দেখা গেছে। চলতি বছরে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে মাত্র ৪৫২ কর্মী দেশটিতে গেছেন, যেখানে গত বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল প্রায় ১ হাজার ৮০০।
এ বিষয়ে অভিবাসন খাত নিয়ে কাজ করা গবেষণাপ্রতিষ্ঠান রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) প্রতিষ্ঠাতা তাসনিম সিদ্দিকী বণিক বার্তাকে বলেন, মালয়েশিয়া বাংলাদেশ থেকে সীমিতসংখ্যক রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী নেয়ার কথা বলছে। তবে এ প্রক্রিয়ায় ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা হবে কিনা তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। তাছাড়া মালয়েশিয়া একদিকে বিদেশী কর্মী কমানোর নীতি গ্রহণ করছে, অন্যদিকে নিজস্ব কর্মসংস্থানে পরিবর্তন আনতে কর্মী ছাঁটাই করছে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ থেকে নতুন কর্মী গেলে তারা কাজ পাবেন কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। যদিও বাংলাদেশী শ্রমিকরা সাধারণত যেসব খাতে কাজ করেন, সেসব খাতে স্থানীয়দের অংশগ্রহণ তুলনামূলক কম। পুরনো সিন্ডিকেট ও আগের ব্যবস্থার মাধ্যমে কর্মী পাঠানো হলে তা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে কিনা সেটি সরকারকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
কর্মী যাওয়া কমলেও বাংলাদেশের রেমিট্যান্স আয়ের ক্ষেত্রে মালয়েশিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দেশটি থেকে প্রবাসী আয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মালয়েশিয়া থেকে দেশে রেমিট্যান্স আসে ১৭৪ কোটি ডলার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা ৬০ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ২৮০ কোটি ডলারে। ওই অর্থবছরে রেমিট্যান্স পাঠানো দেশগুলোর মধ্যে মালয়েশিয়ার অবস্থান ছিল পঞ্চম। আর চলতি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশটি থেকে প্রবাসী আয় এসেছে ২৩৫ কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৪৬ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি। এ সময়ে শীর্ষ রেমিট্যান্স প্রেরণকারী দেশগুলোর মধ্যে মালয়েশিয়া চতুর্থ অবস্থানে উঠে এসেছে।